ব্র্যান্ড এবং ব্র্যান্ডিং কি? কেন প্রয়োজন? বিস্তারিত

ব্র্যান্ডিং বলতে কোন কিছুর নির্দিস্ট একটা পরিচয়কে বোঝানো হয়। আমরা যখন কোন বিষয় নিয়ে কথা বলি বা কোন কিছু দেখি তখন সেই বিষয়ের নির্দিস্ট একটা কোম্পানির নাম চলে আসে এবং তাদের পণ্য বা সার্ভিস গুলো চোখের সামনে ভাসতে থাকে। আর সেই কোম্পানিটা আমাদের কাছে তাদের একটা ব্র্যান্ডিং তৈরি করে নিল।

আজকের এই আর্টিকেল এ আমরা জানব, ব্র্যান্ড কি? ব্র্যান্ডিং কি? কেন প্রয়োজন? এবং আমরা কি কি সুবিধা পাব।

ব্র্যান্ড এবং ব্র্যান্ডিং কি?

আমরা ব্র্যান্ড শব্দটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। ব্র্যান্ড বলতে কোন একটি পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের লোগো, প্রতীক, নাম ইত্যাদিকে বুঝে থাকি। আমেরিকান মার্কেট এসোসিয়েশনের মতে, ‘‘ব্র্যান্ড এমন কোন নাম, শব্দ, ডিজাইন, প্রতীক বা অন্য কোন ফিচার- যা কোন একজন বিক্রেতার পণ্য বা সেবাকে অন্যান্য পণ্য বা সেবা থেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করে।’’ অর্থাৎ ব্র্যান্ড মূলত বাজারে আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে আলাদা এবং স্বকীয় একটা অবস্থান দেয় ।

কোন একটি পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড কথাটি বললেই আপনার মাথায় ঐ পণ্যের বা প্রতিষ্ঠানের আলাদা একটা ছবি ভেসে ওঠে। যেমন, জামাকাপড় বা ফ্যাশন হাউজের অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে আপনাকে যদি ‘আড়ং’ নামটা বলা হয়।

তবে নিশ্চিতভাবে আড়ং প্রতিষ্ঠানটির আলাদা একটি চেহারা, তাদের পণ্যের ধরণ, তাদের জামাকাপড়ের ডিজাইন বা ধরণ আপনার মনে আপনা-আপনি খেলে যাবে। এই কাজটি করা হয় ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে তথা প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ডকে আপনার কাছে পরিচিত করবার মাধ্যমে।

একইভাবে চিন্তা করুন গুগল, ফেসবুক, মার্সিডিজ কিংবা কোকাকোলার কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গাড়ি তৈরির প্রতিষ্ঠান, কোমল পানীয় অনেক আছে। কিন্তু যখনই আপনি এই নামগুলো শুনবেন তখন আলাদাভাবে এদের পণ্য বা সেবার একটা স্বকীয় ছবি আপনার মাথায় আসবে। এই নামগুলো, বা এদের প্রতীকগুলো একেকটি ব্র্যান্ড। এই যে আপনার কাছে আলাদাভাবে এদের পরিচিত করা, এই কাজটিই ব্র্যান্ডিং।

ব্র্যান্ডিং যে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠান বা পণ্যের লোগো বা নামকে চেনানো, তা শুধু নয়। এটি একটি লম্বা এবং নিয়মিত প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত আপনার চোখের সামনে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন আসে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়, বা আপনি সামাজিক মেলামেশাতেই অনেক পণ্যের নাম শুনে থাকেন। এগুলো সবই ব্র্যান্ডিংয়ের মধ্যে পড়ে। এছাড়া পণ্যের প্যাকেজিংয়ের ধরন, ক্রেতার পণ্য ব্যবহারের অভিজ্ঞতা এগুলোও ব্র্যান্ডিং!

ব্র্যান্ডিং কেন প্রয়োজন

সাধারনত আমরা যখন কোন পণ্য কিনতে যায় তখন প্রথমে আমরা পণ্যটি কোন কোম্পানির সেটা দেখে থাকি। এরপর আমরা ঐ কোম্পানির নামের উপর ভিত্তি করে ঐ পণ্যটি কেমন হবে। কারন আমরা ঐ কোম্পানির নামের উপর ভিত্তি করেই আমরা বলে দিই ঐ কোম্পানির পণ্য কেমন হবে। আর এটাই হল ব্র্যান্ডিং এর পাওয়ার। এজন্য সবক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন।

মোট কথা, আপনার ব্যবসায়িক খাতে সাফল্য লাভের একটি বড় ও অপরিহার্য অংশ হল ব্র্যান্ডিং।

আরো পড়ুন: ব্লগিং কিভাবে শুরু করবেন?

ব্র্যান্ডিং এর পাঁচটি সুবিধা

১. ব্র্যান্ডিং আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে মানুষের মধ্যে আলাদাভাবে পরিচিত করে।

শুরুতেই আমরা যেটি দেখলাম, ব্র্যান্ডিং আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে স্বকীয় অবস্থান দেয়। এতে মানুষ আপনার ব্র্যান্ডটির সাথে পরিচিত হয় এবং এর সম্বন্ধে ধারণা পায়। একজন নির্দিষ্ট মানুষের কথা ভাবুনঃ তার কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে, তার কিছু স্বভাব থাকে, তার পছন্দ- অপছন্দ, জামাকাপড়ের ধরন, বন্ধুবান্ধব, কাজ ইত্যাদির মাধ্যমেই তার একটা স্বকীয় পরিচিতি আমাদের মাঝে তৈরি হয়। ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যাপারটাও তাই।

২. ব্র্যান্ডিং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে আলাদা অবস্থান দেয়।

মানুষের সাথে একটা বিশেষ পণ্যের যতটা না সম্পর্ক তৈরি হয়, তার থেকে বরং একটি ব্র্যান্ডের সাথে তার বোঝাপড়া হয় বেশি। ধরুন, কেউ একজন ‘বাটা’র জুতো পরে অভ্যস্ত। অনেকগুলো ব্র্যান্ডের জুতোর মাঝে তাকে নিয়ে গেলে দেখবেন সে আগে বাটা-র জুতোগুলোই দেখছে। এভাবে অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে আপনার পণ্যকে আলাদা করবে আপনার ব্র্যান্ডিং।

৩. ব্র্যান্ডিং আপনার ক্রেতার সাথে আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের আবেগময় সম্পর্ক তৈরি করে।

শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্যি! আগের উদাহরণে যেমন বললাম, ঐ ক্রেতার সাথে বাটা প্রতিষ্ঠানের একটা বিশ্বস্ততার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আপনি যখন আপনার ক্রেতাদের মাঝে ব্র্যান্ডিং করবেন, তখন তার বিশ্বাস অর্জন করতে পারবেন। এতে করে আপনার ক্রেতা বারবার আপনার পণ্যের কাছেই ফিরে আসবে।

৪. ব্র্যান্ডিংয়ে আপনার পণ্যের গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হলে ক্রেতার কাছে আপনার পণ্যটি বেছে নেওয়া সহজ হয়।

ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের গুণাগুণ তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পরিষ্কার হয় তিনি আসলে কী চাচ্ছেন। একই সাথে আপনার পণ্যের প্রতিশ্রুতি তাকে পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করে। আপনি যদি পণ্যের মান ও গুণাগুণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বজায় রাখতে পারেন, তবেই একটি বিশ্বস্ত ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব।

৫. প্রতিষ্ঠানে ভাল কর্মী আকৃষ্ট করতেও আপনাকে সহায়তা করে ব্র্যান্ডিং।

ব্র্যান্ডিং আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের একটি সামাজিক মূল্য তৈরি করে। আপনার ব্র্যান্ডিং যত ভাল হবে, আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতি তত মেধাবী ও সৃজনশীল কর্মীরা আকৃষ্ট হবে। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী, কারণ তখন আপনি একটি দক্ষ কর্মীদলের মাধ্যমে আপনার প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে পারবেন।

উদাহরণস্বরূপ মাইক্রোসফট বা গুগলের কথা চিন্তা করুন। বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ ও মেধাবী কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের স্বপ্ন থাকে এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা। প্রতিষ্ঠানগুলোর সফল ব্র্যান্ডিং তাদের যেমন বিশাল বাজারে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনি এরকম দক্ষ কর্মীদের কাছেও পরিণত করেছে আকাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ।

কিভাবে নিজের একটা ব্র্যান্ড তৈরি করবেন।

নিজের একটা ব্র্যান্ড তৈরি করার জন্য প্রথমে আপনাকে মানুষের প্রয়োজনীয় এবং প্রতিনিয়ত তাদের কাজে লাগতেছে এমন একটা পণ্য বা সার্ভিস খুজে বের করতে হবে। কোন একটা বিষয় ঠিক করার আগে আপনাকে ঐ টা নিয়ে রিসার্চ করতে হবে।

জানতে হবে ঐ পণ্য বা সার্ভিসটি কাদের প্রয়োজন, কারা এটি কাজে ব্যবহার করতেছে। কোন সময়ে এবং কেন ব্যবহার করতেছে। এই সকল কিছু আপনাকে রিসার্চ করে আইডিয়া নিতে হবে। প্রয়োজনে নোট করে রাখতে হবে।
একটা ব্র্যান্ড তৈরি হয় তার কাস্টমার এর ফিডব্যাক এর ভিত্তিতে। কাস্টমার আপনার পণ্য বা সার্ভিস গুলো গ্রহণ করে যতবেশি লাভবান হবে ততবেশি আপনার পণ্যের ভ্যালু বাড়তে থাকবে।

এভাবে আস্তে আস্তে আপনার পণ্য বা সার্ভিস সম্পর্কে সবাই জানতে পারবে এবং আপনার কোম্পানিটিও একটি ব্র্যান্ড এ পরিনত হবে। ব্র্যান্ডিং এর জন্য সবসময় চেস্টা করতে হবে ইউনিক কিছু করার জন্য। কাস্টমারকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য। গ্রাহককে সর্বোচ্ছটা দেওয়ার জন্য। এতে আপনি সহজেই ব্র্যান্ড তৈরি করতে এবং ব্রান্ড ভ্যালু বাড়াতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

0 Shares
Share via
Copy link
Powered by Social Snap